3 আগস্ট 2026, সোম

চরবাগডাঙ্গায় খুন, বোমা ও ষড়যন্ত্র: পিন্টু হত্যার বিচার চেয়ে আতঙ্কে পরিবার

pintu

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নে আলোচিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স আব্দুল হাকিম পিন্টু হত্যা মামলাকে ঘিরে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। মামলার প্রধান আসামিদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতা। একদিকে বাদীপক্ষের ওপর লাগাতার হুমকি, অপপ্রচার ও হামলার অভিযোগ উঠছে; অন্যদিকে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় আব্দুল হাকিম পিন্টুকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে সন্ত্রাসীরা। দীর্ঘ ১১ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ২৩ জানুয়ারি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান। নিহত পিন্টু মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোপন সোর্স হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

পিন্টুর মৃত্যুর পরদিন, ২৪ জানুয়ারি তার বাবা মো. হুমায়ুন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রধান আসামি হিসেবে নাম আসে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা শহীদ রানা টিপুর। মামলায় আরও ১৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়, যাদের অধিকাংশই স্থানীয়ভাবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিহতের পরিবারের দাবি, পিন্টু নিয়মিত শহীদ রানা টিপুর মাদক চক্রের তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সরবরাহ করতেন, এবং এই কারণেই তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের নামও উঠে এসেছে, যাদের বিরুদ্ধে অতীতেও নানা অপরাধের অভিযোগ ছিল।

তবে মামলার পর থেকে অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছে এলাকাবাসী। পরিবারের অভিযোগ, তারা নিয়মিত হুমকি ও ভয়ভীতি পাচ্ছেন। ২ এপ্রিল নিহত পিন্টুর পিতা ও ভাইয়ের দোকানে হামলার অভিযোগ উঠে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শহীদ রানা টিপুর অনুসারীরা দলবদ্ধ হয়ে দোকানে ভাঙচুর চালিয়ে মামলা প্রত্যাহারের চাপ দেয়। একই রাতে চরবাগডাঙ্গায় একাধিক বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে।

৩ এপ্রিল রাতেও এলাকায় পুনরায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ধারাবাহিক এই হামলা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। ওইদিন পিন্টুর বাবা মো. হুমায়ুন চরবাগডাঙ্গা থানায় নতুন একটি অভিযোগ দায়ের করেন, যেখানে ৩৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়, প্রধান আসামি শহীদ রানা টিপু।

পরদিন, ৪ এপ্রিল টিপু ও তার অনুসারীরা পাল্টা মামলা দায়ের করেন। এতে ৪৫ জনকে আসামি করা হয়। নিহতের পরিবারের দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত পাল্টা পদক্ষেপ, যার উদ্দেশ্য মামলার গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়া ও স্বাক্ষীদের ভয় দেখানো।

এদিকে, পিন্টুর স্ত্রী পারভীন বেগমের আচরণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। শুরুতে তিনি হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি তুললেও সম্প্রতি তার অবস্থান পাল্টেছে। নিহতের পরিবার অভিযোগ করছে, পারভীন বেগমকে অর্থের বিনিময়ে আসামিপক্ষ কিনে নিয়েছে এবং তাকে দিয়ে মামলা বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। পারভীনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

নিহতের বোন জান্নাতুন খাতুন লাবনী বলেন, “তিন মাস পার হয়ে গেলেও আসামিরা ধরা পড়ছে না। উল্টো আমাদের ভয় দেখানো হচ্ছে।” তার দাবি, সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের কথাবার্তা এডিট করে ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে।

ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “যেখানে সারা দেশে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে, সেখানে এই এলাকার সবচেয়ে কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী শহীদ রানা টিপু কীভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় — এ প্রশ্ন এখন সবার মুখে।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, টিপু ও তার অনুসারীরা হুমকি দিয়ে বলছে, “একটা খেয়েছি, আরও খাবো। কেউ কিছু করতে পারবে না।” এমন হুমকি ও সন্ত্রাসের মধ্যেও প্রশাসনের নীরবতায় ক্ষোভ আরও তীব্র হচ্ছে।

সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মতিউর রহমান জানান, এজাহারনামীয় ২০ আসামির মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে। তবে নিহতের পরিবার বলছে, এই আশ্বাস বাস্তবে কোনো ফল দিচ্ছে না।

এলাকাবাসী, নিহতের পরিবার এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অবিলম্বে শহীদ রানা টিপু ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তারা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে চরবাগডাঙ্গা এলাকায় বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।