চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নে নৃশংস সন্ত্রাসী হামলায় নিহত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স আব্দুল হাকিম পিন্টুর হত্যাকাণ্ড ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে রহস্যের ঘনকুয়াশা। এক মাস পনেরো দিন অতিক্রান্ত হলেও, খুনি চক্র রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। দাপটের সাথে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও, পুলিশের তরফ থেকে নেই কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ। অথচ এই মামলার প্রধান আসামি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক সম্রাট, চারটি হত্যা মামলার আসামি, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শহীদ রানা টিপু।
নিহত পিন্টুর পরিবারের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড আওয়ামী লীগ নেতা ও মাদক সম্রাট শহীদ রানা টিপু। তার প্রত্যক্ষ মদদেই চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সাহারুল আলম কালু, কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান মিজান, আ.লীগ নেতা আজিজুল ইসলাম, সদর উপজেলা আ.লীগের সাবেক শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক আশরাফ আলীসহ আরও বেশ কয়েকজন এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, পিন্টু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে টিপুর মাদক সাম্রাজ্যের গোপন তথ্য সরবরাহ করায় তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আব্দুল হাকিম পিন্টুকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে একদল সন্ত্রাসী। গুরুতর অবস্থায় তাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হলে, পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ১০ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সাময়িক সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও, ফের অসুস্থ হয়ে মেডিকেলে নিলে ২৩ জানুয়ারি মারা যান পিন্টু।
পরদিন ২৪ জানুয়ারি, নিহতের বাবা হুমায়ুন বাদী হয়ে সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় টিপুকে। এছাড়াও এজাহারে আরও ২০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়, অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়।
মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন—
- শাহিদ রানা টিপু (৫০) – কটাপাড়ার আবু বক্কর ঝাটুর ছেলে, আ.লীগ নেতা এবং তালিকাভুক্ত মাদক সম্রাট
- মোবারক হোসেন গুধা (৩৫) – গিধনীপাড়ার মৃত সাইদুর রহমানের ছেলে
- মিজানুর রহমান মিজান (৩৫) – চাকপাড়ার মোঃ রফিকুল ইসলামের ছেলে
- আজিজুল হক (৪০) – বাখের আলী টিকলিচরের মোঃ জিল্লুর রহমান গাজুর ছেলে
- মোঃ জাহাঙ্গীর (৩৫) – গোঠাপাড়ার মঞ্জুর হোসেনের ছেলে
- সাহারুল ইসলাম কালু (৪২) – কটাপাড়ার আবু বক্কর ঝাটুর ছেলে
নিহত পিন্টুর পরিবারের দাবি, হত্যার দেড় মাস পার হলেও টিপুসহ অন্য আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, অথচ পুলিশ নির্বিকার। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের একাংশকে ম্যানেজ করায় টিপু ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার সম্ভব হচ্ছে না। টিপু শুধু পিন্টু হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড নন, তিনি যুবলীগ নেতা জেম হত্যাসহ চারটি হত্যাকাণ্ডের আসামি।
নিহতের পরিবার জানায়, টিপুর লোকজন এখনো হুমকি দিচ্ছে— ‘একজনকে খেয়ে ফেলেছি, আরও খাবো! প্রশাসন আমাদের কিছু করতে পারেনি, পারবেও না!’ এমন হুমকি প্রতিনিয়ত শুনতে হচ্ছে পিন্টুর স্বজনদের।
পিন্টুর পরিবারের সদস্যরা প্রশ্ন তুলেছেন— যেখানে সরকার মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে, সেখানে এই শীর্ষ মাদক সম্রাট ও তার গডফাদাররা এখনো গ্রেফতার হচ্ছে না কেন? পুলিশের গাফিলতির পেছনে কী রহস্য লুকিয়ে আছে?
পুলিশ দাবি করছে, তারা মামলার তদন্ত করছে এবং তিনজন আসামিকে গ্রেফতার করেছে। তবে স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রধান আসামিরা আজও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘শহীদ রানা টিপুর হাত অনেক লম্বা। প্রশাসনের উপর মহলে তার দখল রয়েছে, ফলে তাকে গ্রেফতার করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
এই বিচারহীনতা যদি চলতে থাকে, তবে সাধারণ মানুষ কি কখনো ন্যায়বিচার পাবে? প্রশ্ন রয়ে যায়, পিন্টুর খুনিরা কবে আইনের আওতায় আসবে?
চাঁটাইম/নিপ্র

